জীবনের শেষ আয়োজন

এমরান মাহমুদ প্রত্যয়

তখন দুপুর। সূর্য তার হলদে রোদের তেজ ছড়িয়ে দিয়েছে। রাহাত চৌধুরী উঠানে বসে চেয়ার পেতে বসে প্রকৃতির প্রখরতা দেখছে। আর বাতাসের সাথে আলিঙ্গন করছে নিজের শরীর ও মন। গ্রামে একটু হলেও প্রভাব আছে রাহাত চৌধুরীর। ছাত্র জীবন থেকে সে ভেবেছে দেশ ও জাতির কথা। ছোট বেলা থেকে একটু লিখার হাত ছিল তার। গ্রামের প্রতিভা, তাই প্রতিভা বিকশিত না হোক! তার চলা ফেরায় ছিল অন্য রকম মাধুর্য্য। গ্রাম আর শহরের পার্থক্য খুঁজেছে প্রতিনিয়ত। দিন, মাস, বছর আর সময়ের পরিবর্তন আর বিবর্তনের চিত্রপটগুলি লালন করছে হৃদয়ে।

মফস্বলের পরে সদর। সদর মফস্বলের তুলনায় উন্নত। তাই মফস্বলের মানুষের আগ্রহী দৃষ্টি থাকে সদরের প্রতি। তেমনি সদরের মানুষেরও কর“ণার দৃষ্টি থাকে মফস্বলের প্রতি। আবার সব সদর এক রকম নয়। উন্নত জীবন চিত্র এর মূল বৈশিষ্ট্য। কারণ অবস্থানগত পরিবর্তনের ফলে আমরা স্বাভাবিক ভাবেই পেছনের অনুন্নত ভাবি। অবজ্ঞা ও অবহেলায় তাদের প্রতি অন্য দৃষ্টি পোষন করি কেন? এর কারন কি? এই জন্যই কি এত আন্দোলন। ত্যাগ আর তিতিক্ষা? কেন? কিসের স্বার্থে এত ভেদাভেদের প্রশ্ন! ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধ। সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারের তাজা রক্ত আর ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ।

রাহাত চৌধুরী একটু পিছনে ফিরে স্মৃতিতে ভেসে ওঠে সেই সব দিনগুলি যা এখনও ভাবলে চোখে জল আসে। মনসপটে ভেসে ওঠে স্মৃতিময় যত আক্ষেপ।

ছোট্ট একটি চাকুরি, বিবাহিত জীবন গ্রামের সুখী পরিবার। সংসারে ফুটফুটে পুত্র সন্তান। অনাবিল আনন্দ। আসে ডাক….. ৭১ এর। শুর“ হয় যুদ্ধ। পরিবার থেকে বিদায় নেয় দেশ বঁাচানোর অভিলাষে। সন্তান, পরিবার, পরিজনের, মমতা, ভালবাসাকে ত্যাগ করে যুদ্ধের ময়দানে। যুদ্ধ স্বাধীনতার জন্য, দেশ রক্ষার জন্য। মাথা উঁচু করে বাচার জন্য। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে আজকের এই স্বাধীনতা। যুদ্ধ শেষ।

গ্রামে ফেরার পালা প্রিয়জনের কাছে। স্বাধীনতার সূর্য মাথায় নিয়ে। সবুজের বুকে লালের উৎভাস। ধীর গতিতে পেরিয়ে গেল অনেক গুলি বছর। অতীত সবই অতীত। সময়ের তাড়াই সবাই ব্যস্ত।

রাহাত চৌধুরী ভাবে, মনে মনে হাসে, আবার বিষন্নতায় একাকার হয়। সে তো দেশে একজন মুক্তিযোদ্ধা নয়, হাজারো হাজার মুক্তিযোদ্ধা কি করছে? এ দেশে কে জানে? কে রাখে কার খবর? কৃষক শ্রমিক তারাও তো মুক্তিযোদ্ধা। নয় মাস যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছে। তবে কেন? এত মানুষে মানুষে ভেদাভেদ। দেশের নৈরাজ্য বেড়েছে সন্ত্রাস, ছিনতাই, খুন,ধর্ষন, নির্যাতন এখন এগুলো কিছুই না।

আজ অনেক দিন পর গ্রামে রাহাত চৌধুরীর পরিবার। ছায়া সুনিবিড় মুক্ত বাতাস, যেন এক নতুন উৎভাসিত দিনের সূচনা। চেনা মুখ হলেও তিনি এখন নতুন ব্যক্তিত্ব। নাতি, নাতনি, ছেলে, বউ, আত্মীয়-স্বজন যেন একটি বিয়ে বাড়ি নব ঢেউ।

কেন জানি কিছু ভাল লাগছে না রাহাত সাহেবের উদাস, নিঃসঙ্গ, একাকিত্ব তাকে গ্রাস করছে। আনন্দ শুধু রাহাত সাহেবের বাড়ীতে নয় পুরো গ্রামে।

এই রাত হলেই সেই কাঙ্খিত দিন ১৬-ই ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস। যত আয়োজন সব রাহাত চৌধুরীর জন্য। সংবর্ধনা দেওয়া হবে তাকে। আজ এতদিন পর শেষ জীবনে। গ্রামের স্কুল মাঠে, সাথে দেওয়া হবে দু’লক্ষ টাকার চেক আর সম্মাননা ক্রেস্ট। এলাকায় বিশাল আয়োজন মঞ্চ, এমপি, মন্ত্রিদের পদচারণা।

ঘটে যায় অন্য ঘটনা, মধ্য রাতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে রাহাত চৌধুরি আকাশে বাতাসে কান্নার রোল ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের ঢল সব আয়োজন শেষ। এখন মেষ আয়োজনটুকু বঁাকী।

ভুলে যায় সবাই ভুলের এই পৃথিবীতে। একই ধারায় চলেছে জীবন। এই পৃথিবীর বুকে। একটি যুদ্ধ, একটি মানুষ………..। সুখ, আনন্দ, দুঃখ জীবনের শেষ আয়োজন।

আরো পড়ুন YouTube

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *