ছায়া বিথী

ছায়া বিথী

আমার বড় আয়েসের দিন তাই ঘুম থেকে দেরি করে উঠি। শোওয়ার ঘরের পিছনে মাঝারি একটা ঝুল বারান্দা আছে। তাতে রকিং চেয়ারটায় হেলান দিয়ে আয়েসটাকে জায়েজ করে বসি। পশ্চিম থেকে সকালের রোদ আসেনা অনেক ক্ষণ বসে থাকা যায়।

এদিকটা লোকালয় থেকে একটু দূরে বলে বেশ । দিব্যি লাগে। চোখের সামনে দিগন্ত বিস্ত ত ঢেউ খেলানো শস্যভূমি, তার মধ্য দিয়ে লাল সুরকির রাস্তা রঙিন ফিতার মতো বেঁধে রেখেছে। ছড়ানো ছিটানো গাছপালা। ছোট একটা টুলে চা রেখে যায় জিল্লুর, মৌজ করে খাই আর পুরনো পেপার পড়ি বেশ সময় নিয়ে। কাজ যে একেবারে থাকে না এমন নয়।
বাংলাদেশের শেষ সীমান্ত অঞ্চল, টেকনাফ। সেখানেই শাহ পরীর দ্বীপে হেলথ সেন্টারে ডাক্তার হয়ে এসেছি।

চবিক্ষশ ঘণ্টাই ডিউটি আওয়ার্স এখানে। সাগরের অগনিত ঢেউয়ের মতো অগনিত রুগী। দু’দ- জিরোনোর অবকাশ নেই। না, দোষ দিচ্ছি না। মানুষগুলি করবেই বা কি? আগে পিছে মাইলের পর মাইল শাহ পরীর দ্বীপের কোথাও কোন আধুনিক চিকিৎসার ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য কেন্দ্র নেই।

সেই লাইসেন্সধারী কোয়াক ডাক্তারই একমাত্র ভরসা। জীবন জীবিকা মৎস্যচাষ সাগরে মাছধরা প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা। ইদানিং একটা পাকা সড়ক হওয়ার তোড়জোড় চলছে অবশ্য জল পথই সচারচর ব্যবহারে সুবিধাজনক। মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মতো নারীরাও প্রকৃতির মতো নির্মল সরল সুন্দর। গ্রামের মান্যগণ্যদের নিয়ে একটা কমিটিও তৈরি হয়েছে। আমাকেও কমিটি ভুক্ত করতে চেয়েছে, কৌশলে এড়িয়ে যাই।

যা হোক, খবরের কাগজ মুখের সামনে ধরে কাপে চুমুক দিতে যাব। মোটর বাইকের ইঞ্জিনের শব্দের সঙ্গে চেঁচামেচিতে চায়ের কাপ ঠোঁটের কাছে ধরেও রেখে দিলাম। দেখি একটা বুড়ো ঝিরকুটে লোককে রাস্তার উপর ফেলে বেধড়ক মারপিট করছে দু’টি ছেলে। লাল গেঞ্জিপরা মাতবক্ষর গোছের লোকটি মনে হলো গু-া-পা-া। বাইকে আসীন হয়ে এক পেশে লড়াইয়ের নির্দেশ দিচ্ছে। আমাদের মধ্যখানে গাছ-গাছড়ার কিছু আড়াল।

আবার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়েছি, কিছু বলবো কিনা ভাবছি। পা-াটি দেখেফেললো আমাকে। সে মনে হলো চেনে আমাকে। চেঁচিয়ে বললো খুব খারাপ হারামি টাইপের লোক সে ছিনতাই করে পালাচ্ছিল। লোকটা অবশ্য প্রতিবাদে কিছু একটা বললো গোঙিয়ে। বুঝলাম না মনে হলো আদিম ভাষা।

এর মধ্যে জিল্লুর এসে পড়েছে বারান্দায়। দেখলাম ছেলে গুলোও এবার অসমরণে ভঙ্গ দিলো। বাইকে চড়ে পড়লো পটপট। তারপর যেমন এসেছিলো তেমনি বিকট শব্দে বাইক হাঁকিয়ে চলে গেলো উল্টো পথে। ছিনিয়ে নেয়া দ্রব্যটি উদ্ধার হলো কি না বুঝলাম না।

জিল্লুর বললো ভিতরে চলুন স্যার। এসব ঝামেলায় থাকবেন না। পচারি পাড়ার ছেলে ওরা, খুব খারাপ। পচারিপাড়া নামটা এখানে আসার কয়েকদিনের মধ্যেই জেনেছি। গঞ্জের সীমানায় কয়েকটা কাঠ চেরাইয়ের কল আছে সেটা পেরিয়ে একটা অদ্যি কালের একচালা ভাঙ্গা বাড়িকে নিয়ে একটা মহল্লা গড়ে উঠেছে টিনের কয়েকটা ঘর। রঙ মাখা মেয়ে মানুষদের বসতি। বিগত যৌবনা থেকে শুরু করে সদ্য রজঃস্বলা দুর্ভাগা কিশোরি, পুরুষের বিরংসা মেটাতে সকলেই

মজুত। পচাই বা বাংলা মদেরও ঠেক আছে একটা। নামটা হয়তো সেটা থেকেই গজিয়েছে। কয়েক দিন আগে একটি এনজিও সংস্থার উদ্দ্যোগে ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্প করেছিলাম সেখানে।
সে এক নিদারুন অভিজ্ঞতা। সে কথা থাক এই মুহূর্তে লোকটিকে কিছু একটা ফাস্ট এইড না দিলেই নয়। জিল্লুর যথারীতি আমাকে নিষেধ করলো। কিন্তু আমি আবার একটু সেকেলে টাইপ।

যতই হোক, শপথ টপথ নিয়ে ডাক্তার হয়েছি বিবেক মানবতা এসব প্রাগৈতিহাসিক শব্দ-টব্দে এখনও হোঁচট খাই। বেসরকারি চাকরির প্রস্তাব ঠুকরে দিয়ে এই সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে এসেছি সেই মূল্যহীন শব্দে কারণে। অতএব মূমুর্ষু একটি মানুষকে রাস্তায় কীভাবে পড়ে থাকতে দেখি। উল্টো জিল্লুরকেই ঠমক দিলাম। সে যথার্থই নিমরাজি। তবে কথা শুনলো রাস্তায় গিয়ে পাঁজাকোলে করে লোকটিকে নিয়ে এসে নীচের বারান্দায় শুইয়ে দিল।

যতই হোক, শপথ টপথ নিয়ে ডাক্তার হয়েছি বিবেক মানবতা এসব প্রাগৈতিহাসিক শব্দ-টব্দে এখনও হোঁচট খাই। বেসরকারি চাকরির প্রস্তাব ঠুকরে দিয়ে এই সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে এসেছি সেই মূল্যহীন শব্দে কারণে। অতএব মূমুর্ষু একটি মানুষকে রাস্তায় কীভাবে পড়ে থাকতে দেখি। উল্টো জিল্লুরকেই ঠমক দিলাম। সে যথার্থই নিমরাজি। তবে কথা শুনলো রাস্তায় গিয়ে পাঁজাকোলে করে লোকটিকে নিয়ে এসে নীচের বারান্দায় শুইয়ে দিল।

বয়স খুব বেশি মনে হলো না, ষাটের এধার ওধার হবে। তবে জিল্লুর নিয়ে এলো বটে। কিন্তু লোকটিকে ধরে রাখা যায়না। ভয়ে হোক বা সংকোচে সে কিছুতেই বসবে না। পাগলের মতো বিড়বিড় করে মাথা নেড়ে কেবলি উঠে পড়তে চায় দু’হাতে ভর করে। শেষে জিল্লুরের ধমকে একটু স্থির হলো। ঘোলাটে চোখে কেমন তীব্র দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ জরিপ করলো আমায়। তারপর অনেকটা যেন বাধ্য কুকুরছানার মতোই চুপটি করে সেবা নিতে লাগলো।

ততক্ষণে আমি তুলোয় ঔষধ লাগিয়ে ফাস্ট এইড শুরু করে দিয়েছি। জিল্লুর এ অঞ্চলের লোক নয় তবু দেখলাম লোকটিকে চিনে। জিল্লুর বললো, পচারি পাড়ার ওধারে একটা শ্মশান আছে, ওখানেই পড়ে থাকতে দেখেছে। হয়তো ভিক্ষে করে খায়। হতে পারে পেটের টানেই কিছু চুরি-টুরি করেছে, ধরা পড়ে অমন বেমক্কা ধোলায় খেলো। যে দেশে যেমন নিয়ম আর কী।

কী আর করি মোটামুটি একটু চিকিৎসা এবং কিছু খাবার-দাবার দিয়ে লোকটিকে খাড়া করলাম। সুস্থ্য হতেই নির্বাক চলে গেলো সে। কিন্তু দেখলাম আমাকে ভোলেনি সে। কৃতজ্ঞতা বসেই হোক কী ক্ষুন্নিবৃত্তির আশা হোক, বাড়ির আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে। আমার সঙ্গে চোখা চোখি ।

হয়। স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে কেমন যেন। মনে হয় কিছু বলতে চায় অথচ বলে না। ইতমধ্যে একদিন সালেম ভাই এলেন। বাষট্টি তেষট্টি বছর বয়স এ অঞ্চলের গণ্যমান্য ব্যক্তি পেশায় ব্যবসায়ী নানা রকমের কারবার। ইদানিং জনসেবাও শুরু করেছেন। শুনছি আগামী বছর উপজেলা চেয়ারম্যান পদে ভোটে দাঁড়াবেন।

পচারি পাড়াতে তাঁর উদ্যোগেই মেডিকেল ক্যাম্পিং বসেছিলো। গ্রামের উন্নয়ন কমিটির সভাপতি তিনি। আমার কাছে এসেছিলেন রক্তচাপ মাপতে। জিল্লুর আবার লোকটিকে দু’চক্ষে দেখতে পারে না। মিছিরি মুখের পিছনে ছুরি নিয়ে ঘোরে না কি?

আমারও অবশ্য তেমনি মনে হয়। অকারণ অমন বিগলিত হাসি ভাঁজ নিয়ে কথা বলা। আর দু’চোখের অমন জম্বুক নজর। ওসবের সঙ্গে যথেষ্টই পরিচিত আমি। তখন চৈত্রমাস, সন্ধ্যে প্রায় শেষ। আকাশ কেমন কালো দমকা বাতাস বইছে। কাল বৈশাখীর পূর্বাভাস টের পাচ্ছি সালেম সাহেব এসেছেন মোটর সাইকেল হাঁকিয়ে। এ চরে এটাও একটা উন্নয়নের লক্ষণ বটে। সাইকেল থেকে মোটর সাইকেল।

তার অবশ্য একটি টয়োটা করলাও আছে। তাঁর স্বাস্থ্য
পরীক্ষার পর একটু খেজুরে আলাপ করলেন। এই যুবক বয়সে এই একলা একলা থাকি কীভাবে? একটা টিভি পর্যন্ত নেই। চাইলে সব ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। এমনকি, পার্ট-টাইম শন্ধবীরও। আমি দার্শনিকের হাসি হাসলাম। এই এলাকার মাতবক্ষর তিনি। চটানো চলে না কোন মতেই। এই হেলথ সেন্টারে ডাক্তারি করি। ঔষধও তেমন সেই রুণী অনুযায়ী।

তার সহযোগিতা প্রয়োজন হবে আমার হাসপাতালে স্বার্থে চুপ থাকতে হবে। সুতরাং কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার মতো সালেমদের সুনজরে থাকতেই হয় আমাদের। চলে যাবার মুখে সেই আধ পাগল বুড়ো লোকটির সঙ্গে মুখোমুখি দেখা গেটের মুখে রাস্তার ওপারে একটা ঝাঁকড়া পলাশ গাছ, বেশ ফুল এসেছে। লোকটি গাছ তলায় নীরব বসে আছে। সালেম ভাইকে দেখতে পেয়েই যেন সে উঠে দাঁড়ালো ঝটাস করে চোখের দৃষ্টি পাল্টে গেল কেমন।

কোটরে বসা গালদুটো একেবারে ইস্পাত কঠিন। ঠোঁট নড়ছে অনবরত। সালেম ভাই বললেন খুব জ্বালাচ্ছে দেখছি। পাগলটা এখানেও এসে জুটেছে। সাবধান থাকবেন ডেঞ্জারাস লোক। শুনে আশ্চর্য হলাম। তবে সালেম ভাইয়ের কথায় প্রত্যয়ই হবো এতটা মূর্খ নই আমি। সে যে মাঝে মধ্যেই এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকে সে তথ্য গোপন রেখে বললাম আপনি চেনেন নাকি? শুধুআমি, এই এলাকার সবাই চেনে। সালেম ভাইয়ের কণ্ঠে কিঞ্চিৎ উপহাস!

পাগোলটা একদিন ভিস্তিওয়ালা ছিলো পানি সাপ্লাই করতো পচারি পাড়ায়। এখন আর তাগদ নেই। এদিক সেদিক ঝেড়ে ঝুড়ে পেট চালায়। খতর নাক লোক। রসও শেষ হয়নি। এই বয়সেও পচারি পাড়ায় গিয়ে হামলা করে।
শুনে কেন জানি বিশ্বাস হল না, তবুও উনার কথাতেই সায় দিয়ে বললাম, থানায় খবর দিলেই তো হয়। তাই দিতে হবে। এখনতো সরকারি কাজেও বাঁধা দেওয়ার তাল করছে। সরকারি কাজে মানে? আরে এই রাস্তার কাজে।

শ্মশানের ধার দিয়ে যাবে রাস্তাটি। হারামজাদা ওখানে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছের নীচে থান গেড়ে বসেছে। বললাম না এই বয়সেও রস খুব। একটা শঙ্করীও আছে সঙ্গে। বলে কিনা রাস্তা ঘুরিয়ে দিতে হবে গাছ কাটা চলবে না। ভাবুন তো কী আস্পর্দা। আমি বললাম, তা রাস্তা একটু ঘুরিয়ে নিলে ক্ষতিই বা কী?সালেমের

সালেমের মুখে বিরক্তির রেখা ফুটে উঠে, স্টার্ট দিতে সজোরে বাইকে লাথি কষালো। খোলস থেকে বেরিয়ে বললে, আপনি মাইরি, শিক্ষিত হয়ে এসব বলেন কী করে। থান, মাজার এসব মানলে চলবে?যতো সব পুরোনো সংস্কার। এসব মানলে চলবে, আপনার সংস্কার আগে নাকি উন্নয়ন? তাছাড়া রাস্তা ঘুরলে অসুবিধা আছে। পচারি পাড়াটা তুলে দিতে হয়। এতোগুলো পেট চলছে, তারা আছে তাই আমরা মন ভালো রাখছি। পচারি পাড়া উঠে গেলে তাদের দায়িত্ব নিবেন আপনি? তা বটে,

এবার আমি খোলসে ঢুকলাম। সালেম চলে যাবার সময় চোখ টিপে বললেন, ফালতু বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাবেন না। ব্যাচেলর মানুষ। একলা আছেন। এনজয় করুন জীবনটাকে একটাই তো জীবন। কিছু দরকার হলে বলবেন আমাকে। আমি আবার সেই দার্শনিকের হাসিটা মুখে ঝলিয়ে দিলাম স্ক্রিন সেভারের মতো। ইঞ্জিনের বিকট শব্দে চলে গেলেন। পরক্ষণেই ঝড় উঠলো। শুকনো পাতার সঙ্গে লাল ধুলোর আবির। এক ছুটে নিজের ডেরায় ঢুকে পড়লাম।

পরদিন রুগী একটু কম ছিলো। কী মনে করে পচারি পাড়া পেরিয়ে শ্মশানের দিকে হাঁটাতে লাগলাম। ইচ্ছে করেই সাইকেল নিলাম না। স্যান্ডেলে লাল ধুলো মাখতে মন্দ লাগে না। আমি না চিনলেও অনেকেই আমকে চেনে তাদের কৌতূহলী চোখের নজরেই বুঝতে পারছি সেটা।

এদিকে একটা তিরতিরে ঝরণার পানি বয়ে চলেছে উপরের পাহাড়ের গা বেয়ে। চারিপাশে শুকনো বালি। গ্রীষ্মকালে অবশ্য তা বিলিন হয়ে যায়। যা হোক, কাঠ চেরাইয়ের কল ছাড়িয়ে

শ্মশান পেরতেই হঠাৎ সেই লোকটিকে দেখতে পেলাম, সাগরের তীর থেকে উঠে আসছিলো তার হাতে ঝরণার পানি ভরা দুটো বোতল। আমাকে সে দেখেছে বলে মনে হলো না। ভালোই হল একদিকে। পিছু নিলাম। আমার অসল গন্তব্য তার ডেরার উদ্দেশ্যেই ছিলো। দেখি কিছুটা হেঁটে একটা লম্বা কৃষ্ণচূড়া গাছের কাছে থামলো সে।

গাছের নীচে খড়ের একটা ঝুপড়ি। শীর্ণতনু প্রৌঢ় মহিলা উবু বসে আছে। শাড়ী পরার ধরনে হরিজন মনে হলো। লোকটি পৌছতে বা আমাকে তার পিছনে দেখে মহিলাটি উঠে দাঁড়িয়েছে। আমি একটু অপ্রস্তুত, দাঁড়িয়ে পড়েছি। কৌতূহল নিয়েই এসে ছিলাম।

কিন্তু এখন কী করবো বা বলবো ঠিক বুঝতে পারছি না। শেষে লোকটিই আমাকে উদ্ধার করলো। বোতল দুটি মাটিতে নামিয়ে হাত টাত নেড়ে সেই আদি ভাষায় কি সব বললো মহিলাটিকে। মহিলা সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এলো আমার সামনে। হাতজোড় করে বললো, “বাবুজি আপনাকে হামি চিনি খুব বড়া ইনসান আছেন। হামাদের বাঁচান বাবুজি।”
মহিলাটি বুড়োর বউ হবে। এবং দেখছি সে আমার দয়াবান হৃদয়ের বিষয়ে ইতিপূর্বেই অবগত।

ভনিতা না করে সরাসরি আর্জি জানিয়েছে তাই সমস্যাটি কী অনুমান করতে পারি সালেম আগেই বলে রেখেছে। তবু জিজ্ঞাসা করলাম। প্রৌঢ়া মহিলা ফুলন্ত কৃষ্ণচুড়া বৃক্ষের দিকে জীর্ণ হাতটা দেখিয়ে বললো, বাবুজি এই যে গাছ দেখছেন। এ আমাদের জান আছে। মানুষ বলছে নতুন সড়ক হবার পর এটা কেটে নেবে। তাতে ক্ষতি কী? অন্য গাছ লাগিয়ে দেব বরং তোমাদের জন্য চেয়ারম্যনকে পাকা ঘর বানিয়ে দিতে বলবো আমি।

বুড়ো বুড়ি এক সঙ্গেই হাউমাউ করে উঠলো। বুড়ি আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল গাছের গোড়ায় দেখি একটা শিবলিঙ্গের মতো পাথর মাটিতে গেঁথে তার উপর ফুলটুলও ছড়ানো রয়েছে বেশ। জানো তুমি বাবুজি এটা কী? ন্যূজ শরীরে যতটা পারা যায় ঋজু হয়ে সোজা আমার চোখের দিকে চেয়ে যা বললো, তাতে বুঝলাম গল্প আছে কিছু। সত্যি বলতে শুনতেই তো আসা। কৌতূহল দেখিয়ে বললাম, কী করে জানবো তুমিই বলো।

আপনি জানেন না? মহিলার চোখে বিস্ময়। মাথা নাড়লাম, বললাম, কী করে জানবো আমি তো নতুন এসেছি এখানে। মহিলা একটু ভাবলো। স্থির দৃষ্টিতে চাইলো আমার চোখে। তারপর চোখ সরিয়ে নিয়ে একটু উদাস গলায় বললো, তবে প্রথম থেকে শুনুন। ত্রিশ বছর আগের কথা নিজের পছন্দে বিয়ে করেছিলাম আমি। কেউ মেনে নেয়নি। তখন গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গেলাম।

এখানে এসে ঘর বাঁধলাম, এখানে জীবিকা নির্বাহ করতাম। পেটে সন্তান আসলো। বাচ্চা হতে গিয়ে মরে যাচ্ছিলাম।

ভগবান বাঁচিয়ে রাখলেন একটি কন্যা সন্তান জন্মালো। ডাক্তার বললো আর কখনো মা হতে পারবেনা। দুঃখ পেলাম না আমার মেয়েটা এতই সুন্দর হলো মন ভরে গেল, নাম রাখলাম রাণী। “একদম রূপ কী রাণী”। দিন ভালোই যাচ্ছিল আমি মানুষের বাসায় কাজ করতাম সে জেলেদের সাথে মৎস্য শিকারে যেতো। রাণী বড় হচ্ছিলো খুব ভয় হচ্ছিলো। গরিবের এতো সুন্দর কন্যা কী মানায়?

কী বলবো বাবুজি যে ভয় করতাম একদিন তাই হলো। আমার মালিক ছিল সালেম সাব, তার ছেলে একদিন রাণীকে নিয়ে পালিয়ে গেল মালিক সালেম বললো চিন্তা করিস না বিয়ে করে ফিরে আসবে। এক মাস পর মালিকের ছেলে একা ফিরলো ঘরে কিন্তু রাণী ফিরলো না। আমরা পঞ্চায়েতে শালিস বসালাম, পুলিশের কাছে গেলাম, কোন লাভ হলো না রাণী হারিযে গেলো। আমি কাজ ছেড়ে দিয়ে খুঁজতে লাগলাম রাণীকে। পেটের দায়ে পানি বিক্রি করে আমার স্বামী পচারী পাড়ায়। কি বলি বাবুজি ওই পাড়াতেই রাণীর সাথে

দেখা হলো। এভাবে পাঁচ বছর পেরিয়ে যায়। কিন্তু রাণীকে আনতে পারলাম না। থানায় গেলাম, গ্রামের চেয়াম্যানের কাছে গেলাম। কোথাও পেলাম না। তার উপর গুন্ডারা এসে আমার স্বামীর জিহক্ষা কেটে ফেললো বাবুজি। থামলো সে কাঁদছে না। কোটরাগত চোখ দূরের নদীর মতো শুষ্ক। জোরে বাতাস বইছে হঠাৎ। মাথার উপরে গাছ থেকে ফুল ঝরছে। উড়ে উড়ে পড়ছে মাথার উপর। ঘর ফেরা কয়েকটি পাখি কিচিরমিচির করছে।

লোকটির দিকে তাকিয়ে দেখলাম। গাছটির মতই নির্বাক। দুচোখে সেই অদ্ভুত দৃষ্টি দ্রবত চোখ সরিয়ে নিলাম। দেখতে পারছি না আর লোকটিকে। মগজের মধ্যে একটা মাইন ফুটিয়ে দিয়েছে বৃদ্ধা। তার পর কী হলো জানতে চাও বাবুজি। মহিলা বিরবির করে আবার বলতে শুরু করলো। এক দিন সালেম সাব ত পচারি পাড়ায় গেলো রাণীকে বলে এই খাবার খেয়ে নাও তোমাকে তোমার বাবা-মার কাছে দিয়ে আসি। সে খুব অত্যাচারি লোক সে কথা রাণী ভুলে যায়।

রাণী বুঝতেই পারিনি সেটা ছিলো বিষ মিশানো খাবার রাণী বাড়ি ফেরার আনন্দে তাড়াতাড়ি খেয়ে নিলো তারপর ঢুলতে ঢুলতে বাড়িতে এলো। রাণী মুখে সাদা ফ্যানা উঠে মারা গেল। সালেম রাণীকে ঠিকই ফিরিয়ে দিলো। আমরা পেলাম লাশ। তার পর সালেম শাসিয়ে গেল যদি কেউ জানে তোদের দুজনকেও মেরে ফেলবো।

রাণীর লাশ ছুঁবে না কেউ পতিতা ছিলো তাই ওই নদীর কিনারে আমরাই পোড়ালাম তাকে। একটু ভাবো বাবুজি রাণীর এই অবস্থা কে বানালো নির্লিপ্ত গলায় বলছে মহিলা। আমি পুরো স্ট্যাচু। স্থবিরের মতো শুনছি। চোখে পানি না এলেও মহিলার গলায় এখন জমাট বাষ্প। ঢোক গিলে বললো আপনি বিশ্বাস করবেন না বাবুজি, যে যেয়েকে জিন্দা পাইনি আমরা জানতাম তবুও বেঁচে আছে।

যাকে পাঁচ বছর ধরে চেয়েছি কেউ পাশে দাঁড়ায়নি। মরে যেতেই আমরা পেয়ে গেলাম আমাদের রাণীকে। আমার সত্যি শরীর কেমন ছমছম করছে। বুড়ো আচমকাই কী একটা বলে উঠলো গোঙিয়ে। মহিলা সেদিকে একটু নজর দিয়ে বললো,

জানেন নতুন অনেক সুন্দরী কিশোরি, তরুণীদের ওরা নিয়ে আসে জোর করে পতিতা বৃত্তি করায়। রাণীর বাবা গিয়ে হামলা করে মেয়েদের বাঁচাতে কেউ এগিয়ে আসে না তার সাথে। পুলিশও তার কথা শোনে না। আপনি তাদের বাঁচান।
যখন ইচ্ছা তখন সালেমের গুন্ডারা রাণীর বাবাকে ধরে মারে কখন যে মেরে ফেলে ভয়ে থাকি সব সময়। আমি চুপ করে ভাবছি কী করা যায়।

লোকটিকে সেদিন পেটানোর কারণ পরিষ্কার হলো এতক্ষণে। আপনি শুনছেন তো বাবুজি? মহিলা বলেই চলেছে হ্যাঁ শুনছি মাথা দোলালাম আমি মহিলা সেই পাথরটার দিকে হাত দেখিয়ে বললো, রাণীকে পুড়িয়ে দিয়ে ছাঁইয়ের সাথে যা কিছু ছিলো সব পুঁতে দিলাম এইখানে। তারপর এই পাথর চাপিয়ে দিলাম ভগবান শিব লিঙ্গের,

রাণীর আত্মার শান্তি চেয়ে। তখন এই গাছ ছিলনা রাণীর বাবাই ঐ কৃষ্ণচূড়ার গাছ লাগিয়েছিলো। বড় সুন্দর ছিলো আর ফুলের মতো নরম কোমল ছিলো সে। এখন এই গাছের নিচেই কেমন জীবন্ত রাণী। আবার চুপ করে পরম মমতায় কৃষ্ণচুড়ার গুড়িতে হাত বোলাচ্ছে সে কেঁদে উঠলো।

তারপর আচমকা বসে পড়লো মাটিতে। এতক্ষণে দেখলাম তার দুচোখ ভেসে যাচ্ছে পানিতে, তবুও দম নিয়ে বললো আপনি বলেন বাবুজি এই গাছ আমি কীভাবে কাটতে দেই।

যে গাছের নীচেই আমার রাণী শুয়ে আছে। আপনি কিছু করেন দ্বিতীয় বার রাণী থেকে আমাদের সরিয়ে দিবেন না। আমি দেখছি বলে আর থাকতে পারিনি, ফিরে এলাম ডেরায়। আজও স্বপ্নে দেখি অপরূপ এক পরী এসে বলছে বাবুজি আমি রাণী, ঘুম ভেঙ্গে দেখি দু’চোখে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।

ছায়া বিথী সাধারণত মানবজীবনের নিঃসঙ্গতা, স্মৃতি আর অতীতের ছায়া নিয়ে লেখা একটি সংবেদনশীল গল্প

গল্পে দেখা যায়, প্রধান চরিত্র জীবনের নানা ব্যর্থতা ও কষ্টের মাঝেও অতীতের স্মৃতিগুলোকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকে। “ছায়া বিথী” প্রতীকীভাবে এমন এক পথকে বোঝায়, যেখানে আলো-অন্ধকার মিলেমিশে আছে—ঠিক

মানুষের জীবনের মতো। গল্পে সম্পর্কের টানাপোড়েন, একাকিত্ব, এবং মনের ভেতরের অপ্রকাশিত অনুভূতিগুলো ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে। শেষ পর্যন্ত চরিত্রটি বুঝতে পারে, জীবনের ছায়ার মধ্যেও আশার আলো খুঁজে পাওয়া যায়।

স্বাগতম “শিরোনাম সাহিত্য”-এ — আমার হৃদয়ের ক্যানভাসে।
এই ব্লগটি আমার স্বপ্ন, ভাবনা আর সৃজনশীলতার একটি আড্ডাখানা।
এখানে বাংলা সাহিত্যের রঙে মুখর হয়ে ওঠে কবিতা, গল্প আর জীবনের ছোট ছোট মুহূর্ত।

আমি একজন গল্পকার, কবি এবং বাংলা ভাষার একনিষ্ঠ প্রেমিক।
“শিরোনাম সাহিত্য” আমার সেই প্রয়াস, যেখানে শব্দ দিয়ে গড়ে তুলি আবেগ, চিন্তা আর কল্পনার জগৎ।

এখানে পাবেন হৃদয় ছোঁয়া কবিতা, জীবনের গল্প, আর সাধারণ মুহূর্তের অসাধারণ রূপ।

আমার লক্ষ্য 

বাংলা ভাষার প্রেমীদের জন্য একটি আশ্রয় তৈরি করা।
যেখানে শব্দের জাদুতে আমরা সবাই হারিয়ে যেতে পারি।

3 thoughts on “ছায়া বিথী

  1. Pingback: stendra generic

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *