এমরান মাহমুদ প্রত্যয়
রিমঝিম যখনই সময় পায় ছাদে এসে একাকী দঁাড়িয়ে থাকে। দু’তলার ছাদ উপরে আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে বলেই ছাদের রেলিং দেওয়া হয় নি। ছাদের কিনারে দঁাড়িয়ে নিচের দিকে চাইলেই রিমঝিমের কেমন গা টা ছমছম করে ওঠে। তবু তার ছাদে বেড়াতে ভালো লাগে, আকাশ দেখতে পছন্দ করে, তারা দেখতে ভালোবাসে।
তিন দিনের অবিশ্রান্ত বর্ষণের পর আজ বিকেলে বৃষ্টি থেমেছে। গত তিন দিন আকাশের মুখ দেখা যায় নি। অভিমানের মেঘে আকাশের মুখ ঢঁাকা ছিল। আজ বিকেলে মেঘের ঘোমটা সরিয়ে প্রশান্ত মুখ খানি উকি দিয়েছে।
আকাশের কাল আঁচিলে এখন তারাদের চুমকির ঝিকিমিকি। খোলা ছাদে রিমঝিম একা, আকাশে লক্ষ তারার দিকে চোখ। একটু আগে দু’চোখে অশ্র“ ছিল। রিমঝিম যখনই একা হয় তখনই ওর চোখে অশ্র“ নামে। বেশির ভাগ সময়ই রিমঝিম একা থাকে, তাই বেশি সময়ই ও থাকে অশ্র“ময়ী।
কেন? অশ্র“ ঝড়ে রিমঝিমের, কে জানে! আকাশে ঐ যে তারার মেলা। তার কোথায় আছে কাল সেই বিশাল গভীর গর্তটা। যার নাম ব্যাক হোল।
অশ্র“হীন চোখে আকাশ দেখতে দেখতে সেই কথাটায় ভাবে রিমঝিম। একদিন এই পৃথিবী ঐ ব্যাক হোলই কি বিলীন হয়ে যাবে। সেটা করে, কতদিন পরে আসবে সেই দিনটি। মৃত্যুর পর কোথায় যায় মানুষ। ঐ মহাকাশের কোথাও কি আছে স্বর্গ? আর ব্যাক হোলের অতল অন্ধকারে নরক?
অজস্র প্রশ্নের সাগরে ভাসতে থাকে রিমঝিম। এটাই কি ঠিক। পূণ্য কর্মের পুরস্কার স্বর্গবাস, আর পাপ কর্মের শাস্তি নরক বাস। কোনটা পাপ আর কোনটা পূণ্য। মনের ইচ্ছা গুলোকে পাথর চাপা দিয়ে রেখে দেওয়ায় কি পূণ্য, আর ইচ্ছাগুলো প্রকাশ হলেই পাপ।
দুপুরে ঘটনাটা আবার মনের পর্দায় ভেসে উঠল রিমঝিমের। সঙ্গে সঙ্গে শরীর ঘিরে আশ্চর্য আনন্দের ঝড় বয়ে গেল। নিজের ঠেঁাটের রেখা ধরে ধরে আঙ্গুল বুলিয়ে গেল, যেন পরশ পেল অন্য কারও আঙ্গুলের। হাত ছেঁায়ালো কপালে, গালে ঘাড়ে, পিঠে, বাহুতে সর্বত্রে।
হাত বুলালো অধরে। স্নিগ্ধ একটি লাজুক হাসি ফুটে উঠল। কিস, কিস করে উচ্চারণ করল রিমঝিম, ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি……….। তোমার প্রতিটি ছেঁায়ায় আমাকে ধন্য করেছে। তোমার প্রতিটি ছেঁায়ায় আমি ভালোবাসি।
হৃদয়ের হাত দু-খানির কথা মনে পড়লো রিমঝিমের। শিল্পী হাতের মত সুন্দর দু-খানি হাত হৃদয়ের। অথচ ঐ হাত দু-খানি যখন রিমঝিমকে স্পর্শ করেছিল তখন তার মনে হয়েছিল, কি বিরাট ঐ দু-খানি হাত, কি অসীম শক্তি ঐ হাত দুটিতে।
আবার আলতো হাসি ফুটে উঠল রিমঝিমের অধর প্রান্তে। অতীতের সকল স্মৃতি মনের গহীনে হানা দিতে লাগল তার। দুপুরে ঘটনাটির পর রিমঝিম অবশ্য বালিশে মুখ গুজে আকুল হয়ে কেঁদেছিল কিছুক্ষণ। এখন ভালো লাগছে হৃদয়ের কথাগুলো ভাবতে।
হৃদয়ের বিব্রত, লজ্জিত, অনুতপ্ত মুখ খানার কথা মনে করতেই রিমঝিমের মায়াই হচ্ছে। তার কি দোষ, হৃদয়ের তো কোন দোষ নেই। রিমঝিম-ই তো হৃদয়ের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে গিয়ে দঁাড়িয়েছিল। হৃদয়ের চুল গুলো এলমেল করে দিয়েছিল নিজ হাতে।
সে তো বাধ্য করেছে তা করতে। হৃদয় রিমঝিমের চিরজীবনের স্বপ্নের পুর“ষ। হৃদয় রিমঝিমের জীবনের প্রথম ফাগুন, ফাগুনের উত্তাল দক্ষিণা হাওয়া। রিমঝিমের বুক ভরা আনন্দ। হৃদয় রিমঝিমের ভরা শ্রাবণের বিরহীর বুক ভাঙ্গা কষ্টও বৈ কি?
হৃদয়কে ভাবতে গিয়ে রিমঝিম ভুলে যায় তার চার পাশের জগৎ সম্পর্কে। ভুলে যায় ও অবস্থান কেও। রিমঝিম ভাবে প্রেম ভালোবাসা তো অপরাধের কিছু নয়। কিন্তু কেন মেনে নেয় না এই সমাজ। বাস্তবকে। সত্যকে কেন অস্বীকার করবে।
একজন ছেলের বেলায় যা অপরাধ নয়, একজন মেয়ের বেলায় কেন তা অপরাধ। কেন তার ইচ্ছার কোন মূল্য থাকবে না। কেন-ই বা মা-বাবার ইচ্ছাকে মেনে নিতে হবে। কেন রিমঝিমকে তাদের ইচ্ছের পুতুল হয়ে বেঁচে থাকতে হবে।
নারী বলে কি নিজের ইচ্ছা গুলোকে গলা টিপে হত্যা করতে হবে। তারও তো পছন্দ থাকতে পারে। ধনী পিতার একমাত্র মেয়ে রিমঝিম। সংসারে অনেক কাজ-ই সে নিজ হাতে করে, প্রয়োজন নেই, তবুও করে।
বিছানা পত্র গোছানো, বাগানে পানি দেওয়া ইত্যাদি কাজ সে নিজের হাতেই করে। নতুন ফুলের ঘ্রাণ নেয় বুক ভরে ফুলদানিতে ফুল সাজায়, বই পড়ে কলেজে যায়, গান শোনে, ছাদে বেড়ায়, আকাশ দেখে, তারা গোনে, তবুও অনেক সময় থেকে যায় রিমঝিমের হাতে। সে সময় হৃদয়কে ভেবে কাটিয়ে দেয়।
আজ হঠাৎ হৃদয় এলো-জান রিমঝিম তোমাকে দেখলাম, যেন বৃষ্টিকে দেখলাম। তুমি যেন আমার খরতপ্ত জীবনে এক ফোটা বৃষ্টি হয়ে এলে। দু-হাত বাড়ায় হৃদয় রিমঝিমের দিকে, রিমঝিম সাগ্রহে সে হাত ধরে চেপে।
বসন্তের কোকিল ডেকে ওঠে, রিমঝিমের ফুল বাগানে, পাখির গানে, ফুলের সুবাসে, বসন্তের সঙ্গীতে। মনটা ভরে গেল হৃদয়ের ভালোবাসায়। রিমঝিমের প্রতিটি মুহুর্তকে কবিতায়, গানে, রঙ্গে রঙ্গে, আনন্দে আনন্দে ভরিয়ে দিল।
একদিন নির্জন সন্ধ্যায় ব্যাকুল স্বরে হৃদয় বলে রিমঝিম আমি আর পারছি না। আমি একান্ত আপন করে তোমাকে পেতে চাই। শিহরিত হয় রিমঝিম ভাবে, অনেক কিছু। চোখের নদীতে ওর অশ্র“র পাবন আসে, সে পাবনে ভাসতে ভাসতে সে বলে, না-না-না-, তা হয় না।
অবাক হয় হৃদয়, কেন হয় না? রিমঝিম আজ এতদিন পর। তুমি কি ভালোবাস না আমাকে।
এমন ভালোবাসা তো কাউকে বাসিনি হৃদয়। তবে কেন তোমার এত দ্বিধা, সংকোচ?
ভালোবাসলেই কি তাকে পেতে হবে হৃদয়……..!
নিশ্চয়? যাকে ভালোবাসি তাকে ছেড়ে থাকবো কি করে। আমি তো কোন বায়বীয় ভালোবাসায় বিশ্বাস করি না। রিমঝিম আমি তোমাকে চাই! শুধু তোমাকে চাই! তোমার পরশ চাই! তোমার ভালোবাসা চাই।
রিমঝিম ডুকরে কেঁদে উঠে। প্রচন্ড ঝড়ে বিধস্ত পাখির মত দ্বিধা ভয় সংকোচ আদর স্নেহ, ভালোবাসা সব কিছু ছিন্ন করতে চায়। মন তবু বঁাধন ছেঁড়ার আহবানে সাড়া দিতে পারে না।
দার“ণ অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নেয় হৃদয়। আবার ফিরে আসে রিমঝিমের ব্যাকুলতা সহ্য করতেন না পেরে। একা নিমিষে অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করে হৃদয়। প্রচন্ড একটি ঝড় এসে যেন তছনছ করে দিল সব।
সেই দিন-ই রিমঝিম অন্ধকার ছাদে দঁাড়িয়ে মনস্থির করে- সকলের আদর, স্নেহ, মমতা ভালোবাসা ছিন্ন করে চলে যাবে। সকলের অগোচরে ঘর থেকে। সবাইকে ফঁাকি দিয়ে।
ছোট্ট একটি ব্যাগে টুকি টাকি জিনিস পত্র গুছিয়ে নেয় রিমঝিম। বারবার ঘড়ির দিকে চায় ও। হৃদয়ের কাছ নির্দিষ্ট জায়গায় যাবার এখনো এক ঘন্টা বঁাকী। এর মধ্যে ছাদে উঠে রিমঝিম।
অন্ধকার ছাদ। তারা ভরা অন্ধকার আকাশের পানে চেয়ে আবারও রিমঝিমের মনে হয় ব্যাক হোল কোথায় আছে, সেই বিশাল গর্তটা।
সেই ব্যাক হোলটা কবে বিলীন হয়ে যাবে পৃথিবী থেকে। কোথায় আছে স্বর্গ? কোথায় নরক? কোন পূণ্যে মানুষ স্বর্গের বাসিন্দা হয়। কোন পাপে নরক বাস।
আমি কোথায় যাব? আপন মনে প্রশ্নের সাগরে ভাসতে ভাসতে রিমঝিম ছাদের কিনারে এগিয়ে যায়। নিচের দিকে চায়, অনেক নিচে অন্ধকার বাগানটা চোখে পড়ে।
আজ কি বাগানটা পরিচর্যা করা হয়েছে। কি জানি? আজ বাগানে যাওয়া হয় নি। কোন নতুন ফোটা ফুলের ঘ্রাণ নেওয়া হয় নি। আর একটু এগিয়ে যায় রিমঝিম।
হঠাৎ ইচ্ছে হল বাগানের ফুলগুলো ছঁুয়ে ছঁুয়ে দেখতে, ইচ্ছে হল বুকভরা ফুলের ঘ্রাণ নিতে। অথচ ইচ্ছে হল না সিঁড়ি বেয়ে আবার নিচে নামতে। রিমঝিম ভাবে কেমন হয় যদি এখান থেকেই হাত বাড়িয়ে ছেঁায়া যায় ফুল গুলোকে। তাই করবে রিমঝিম।
এখান থেকেই ফুল গুলোর কাছে চলে যাবে, আর এক পা সামনে এগিয়ে গেল। ছাদের কার্নিশে পা রেখে দঁাড়ায়, সোজা হয়ে অন্ধকারে।
আকাশ পানে চায়, চায় নিজের দিকেও। ফিস ফিস করে বলে, আসছি, আসছি আমি আসছি। রিমঝিম এক সাথে দুটো পা তুলে নিল কার্ণিশ থেকে। শূন্যে ছুড়ে দিল পা দুটোকে।
হৈ চৈ চিৎকার, আর্তনাদ। অনেক অনেক রক্ত।
রিমঝিমের শরীরটা ফুল গাছের পাশে খোয়া বঁাধানো পথে, লাল ফুলের রেণু মেখেলাল হয়ে ফুলের তীব্র সুবাস নিয়ে পড়ে রইল…? পারলাম না, আমি পারলাম না, আমি কিছুতেই পারলাম না রিমঝিম।
পরাজিত সৈনিকের মত হেরে গেলাম। কারার“দ্ধ পায়ে বেড়ি পড়ানোর মত এক কয়েদির অস্পষ্ট বেদনা তীর ক্লান্ত অসহায় বোধ।
জীবনের চিত্রকার অবস্থায় হৃদয় দু-হাত মুখ আবৃত করে।
চোখে টলমল জলরাশি।
গল্প সম্পর্কে
পরাজয় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি সাফল্যের পথে একটি ধাপ। পরাজয় আমাদের ভুল থেকে শিখতে সাহায্য করে এবং আরও শক্তিশালী হতে অনুপ্রাণিত করে।
যদিও পরাজয় বেদনাদায়ক হতে পারে, এটি আমাদের অভিজ্ঞতা অর্জনে এবং নতুন করে চেষ্টা করার সুযোগ করে দেয়।
পরাজয় মানে হারানো নয়, বরং আরও ভালোভাবে ফিরে আসার একটি সুযোগ।—
মাইকেল জর্ডান ।পরাজয় আমাদের শেখায় বিনয়ী হতে, ধৈর্য ধরতে এবং জীবনের কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে।
এটি আমাদের চরিত্র গঠন করে এবং ভবিষ্যতের সাফল্যের জন্য প্রস্তুত করে তোলে।
আমাদের সম্পর্কে
স্বাগতম “শিরোনাম সাহিত্য”-এ — আমার হৃদয়ের ক্যানভাসে।
এই ব্লগটি আমার স্বপ্ন, ভাবনা আর সৃজনশীলতার একটি আড্ডাখানা।
এখানে বাংলা সাহিত্যের রঙে মুখর হয়ে ওঠে কবিতা, গল্প আর জীবনের ছোট ছোট মুহূর্ত।
আমি একজন গল্পকার, কবি এবং বাংলা ভাষার একনিষ্ঠ প্রেমিক।
“শিরোনাম সাহিত্য” আমার সেই প্রয়াস, যেখানে শব্দ দিয়ে গড়ে তুলি আবেগ, চিন্তা আর কল্পনার জগৎ।
এখানে পাবেন হৃদয় ছোঁয়া কবিতা, জীবনের গল্প, আর সাধারণ মুহূর্তের অসাধারণ রূপ।
আমার লক্ষ্য:
বাংলা ভাষার প্রেমীদের জন্য একটি আশ্রয় তৈরি করা।
যেখানে শব্দের জাদুতে আমরা সবাই হারিয়ে যেতে পারি।
অসাধারণ গল্প লিখেছেন আপনি। আগামীর জন্য শুভ কামনা রইল।
এমন পরাজয় কত জনের জীবনে রয়েছে জানি না। লেখাটা প্রশংসার দাবিদার লেখক অসাধারণ লিখেছেন ভালোবাসা রইলো ❤️💙