ভালোবাসার যোগ-বিয়োগ

ভালোবাসার যোগ-বিয়োগ

ভরা গাল সুন্দর আকৃতির গোল মুখ। ভারী চেহারা। পালিশ করা গায়ের রঙ। যেন এই মুহূর্তে স্নান করে বেরিয়ে এলো শরৎ কন্যা। ঠোটের নিচে চাপা লুকানো হাসি। চেহারা দেখে মোটেও বুঝার উপায় নেই, একেবারে কচি সরল।

রূপার সাথে প্রথম পরিচয় রবির সাত বছর আগে। মানুষের মন কখন কিভাবে কার সাথে মিশে একাকার হয় কেউ জানে না এক খোদা ছাড়া। রূপা তখনও স্কুলের গন্ডি পের“য়নি। কচি আর সরল মনের ভালোবাসা ঠিক রূপকথার গল্পের মত।

রূপা মা-বাবার একমাত্র আদরের ধন। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম। যত আবদার যত বায়না শুধু মুখে বলা। স্কুল ছুটি বান্ধবীদের নিয়ে ফুচকা, চটপটি, আইসক্রিম খাবার ধুম।

একদিন মায়ের ফোন থেকে ভুল নম্বর ডায়াল করে পরিচয় হয় রবির সাথে। সেই শুর“। সেই দুজনার পথ চলা। অদেখা অন্ধ ভালোবাসা। দুজনার দূরত্ব ছিল শত মাইল কিন্তু মন ছিল খুব কাছে অতি নিকটে আর ব্যবধান ছিল শহর আর গ্রাম।

শহরের আধুনিকতায় উজ্জীবিত রূপা আর গ্রামের সহজ সরল রবি। প্রেম ভালোবাসা তো দূরত্ব

মেপে হয় না। সময় যায় সময় আসে, ফিরে কি আসে অতীত। চোখের আড়াল হলে মানুষ মনের আড়াল হয় এ কথা আজও বিশ্বাস করে না রবি। বিশ্বাস মানুষকে বঁাচতে শেখায়।

রবির পরিবার মধ্যবিত্ত। মানুষের সব চাওয়া- পাওয়া, স্বপ্ন-আশা কি পূরণ হয়। রূপার ভালোবাসায় অন্ধ ছিল রবি, ভুলে গিয়েছিল ধনি-দরিদ্র, গ্রাম-শহরের ব্যবধান।

আজও ভাবে বিশ্বাস মনে রেখে। হৃদয়ে লালন করে রূপার ভালোবাসা। প্রহর গুনছে রবি, পার করছে দিন, মাস, বছর।

রূপার মা রাশেদা খানম একজন রক্ষনশীল মহিলা। মেয়ের এমন ভালোবাসা মেনে নিতে পারেনি। এক মাত্র মেয়ের এমন ফোনে সব সময় কথা বলা সে এক দম-ই পছন্দ করে না।

কি করে মানবে একটি গ্রামের ছেলেকে জামাই হিসাবে। না সে ভাবতে পারে না। যে মেয়ে জন্মেছে শহরে , শহরের আলো বাতাসে যার বেড়ে ওঠা, সে কি করে থাকবে গ্রামের জীবনে যে গ্রাম দেখেনি।

আর এত দূর একমাত্র মেয়েকে ছেড়ে কি করে থাকবে। রূপার বাবা মেয়ের মতের বির“দ্ধে যায়নি কখনো। কিন্তু মা..? প্রেম ভালোবাসা দুটি হৃদয়ের এক আত্মা। সে ভালোবাসা মা-বাবা, আত্মীয় স্বজনের ভালোবাসা স্নেহ কেও হার মানায়।

মেয়ের এমন অবস্থায় চিন্তায় পড়ে যায় রূপার মা। রূপা মন প্রাণ উজার করে ভালোবাসে রবিকে যে কোন মূল্যে যে কোন ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত। আর রবি তার জীবনের চাইতেও বেশি ভালোবাসে রূপাকে। অদেখা ভালোবাসা দুটি মনের আত্মার মিলন। রূপা যে মন প্রাণ সঁপে দিয়েছে রবিকে কি করে ভুলে যাবে। কোন কিছুতেই পরিবর্তন নেই দুজনার।

 রবিকে অপমান করে রূপার মা। কি আছে তোমার? কি দিতে পারবে আমার মেয়েকে ওর এক দিনের খরচ চালানোর মত অর্থ আছে তোমার। আমি জানি তোমরা গ্রামের ছেলেরা অনেক স্বার্থপর।
 আমাদের টাকার উপর তোমাদের বড় লোভ।

 যেন বড় লোকের মেয়েদের প্রেমের জালে ফাসাতে পারলেই......................? নির্বাক রবি। আরো বলে আমার মেয়ের সুখের জন্যে তুমি যা চাও আমি তোমাকে তাই দেব। দয়া করে আমার মেয়ের জীবন থেকে সরে যাও তোমার দুটো পায়ে পড়ি,

 আমি মা তোমার মা যদি তোমার কাছে কিছু চাই তো পারতে তুমি না দিয়ে থাকতে। দুঃখ কষ্টে রবির হৃদয়টা ক্ষত বিক্ষত হয়ে যায়।যাকে না দেখে এক ভালোবেসেছে কি করে ভুলে যাবে।

 কি করে কষ্ট দেবে - রূপাকে। রূপা যে তাকে তার জীবনের চাইতে বেশি ভালোবাসে। কি করে ঠকাবে রূপাকে এ যে পাপ এ যে মহাপাপ না আর কিন্তু মা......? 

রূপার সুখের জন্যে হাসি মুখে সব কিছু করতে পারে রবি। রবি জানে না তার জন্যে কি অপেক্ষা করছে। একটা সরল মনের ভালোবাসা এক সেকেন্ডের মধ্যে শেষ। 
অবিশ্বাস মানুষ কে কোথায় নিয়ে যায় রবি ছাড়া বেশি কেউ জানে না এ পৃথিবীতে। 

ঘৃণা আর অবিশ্বাস আজ রূপার মনে কি সৃষ্টি হয়েছে তা শুধু রূপা-ই জানে। ও ঘৃণা করে রবি নামের লম্পট, বদমাশ প্রতারক কে। পৃথিবী এক অজ্ঞাত রহস্যে ভরা। খোদা জানে এর আসল রহস্য। রবি প্রতি নিয়ত ফোন করে রূপাকে। 

রূপার মা দেয় না হয় তো রূপাই কথা বলে না ঘৃণায়। বলে রূপা তোমাকে ঘৃণা করে তোমার মত ছেলেকে সে ভালোবাসে না। সে জানে রূপার সাথে একটু কথা বললেই রূপার ভুল ভেঙ্গে যাবে।

 সময় যায় তার ধারায় রবির কষ্ট বারে। এক একটা ভুল আজীবন কপালে কাল দাগ এঁকে দেয়। রবি শুধরাতে পারে না তার ভুল। যে অপরাধ সে করেছে কি দোষ ছিল রূপার, ভাবলেই রবির বুকটা ব্যথায় টনটন করে।

 আজ ২০ সেপ্টেম্বর বিয়েতে মত দিয়েছে রূপা। আজ রূপা চলে যাবে অন্যের ঘরে। লাল বেনারশি পড়ে যে আসতো রবির ঘরে আজ শুধু একটি ভুলে রূপা অন্যের ঘরণী। কি করে মেনে নিবে রবি। বুকের ভেতর কষ্টের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে। কাকে বলবে রবি তার হৃদয়ের ক্ষত।

এমন করে কেটে যায় সময় নদীর স্রোতের মত স্বামীকে মন প্রাণ উজার করে ভালোবাসে রূপা। ভুলতে চেষ্টা করে রবিকে। অল্প সময়ে রূপার কোল জুড়ে আসে একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তান। তাকে বুকে নিয়ে এখন তার সময় কাটে। 

নিজ হাতে সাজানো সংসার। সুখের একটুকু কমতি নেই। টাকা-পয়সা অর্থ বৈভব। দোতলা ফ্ল্যাট।  রবির বয়স বাড়ছে, চুলের পাক ধরেছে সেই কবে। বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে। 

পরিবারে মা অসুস্থ্য তারপরও বিয়ের কথা মুখে নেয় না। অনেক চেষ্টা করেও কেউ রাজি করাতে পারেনি। পৃথিবীতে দুটি জিনিস খুব দুষ্প্রাপ্র্যে এক মানুষের মন আর মনের মানুষ। রবির ব্যস্ত সময় কাটে সাহিত্য সেমিনার করে। সব সময় হাসি খুশিতে থাকে মিশে সবার সাথে সমান তালে। বাহির থেকে কেউ বুঝতেই পারবে না তার হৃদয়ের ক্ষত।

কখনো একা থাকলে অতীতে ফিরে, উদাস দৃষ্টিতে ভাবে কি? শুধু তারই জানা! প্রিয় আসে এক এক এক আবার ফিরে যায় যে যার গন্তব্য। কখনো নিজের বয়স নিয়ে ভাবেনি। 

যৌবনের উচ্ছলতায় গা ভাসিয়ে উদ্দাম গতিতে তরতর বেগে ছুটে চলছে জীবন সংগ্রামের এক অদম্য পথিক। চিরদিন কর্মে বিশ্বাসী তাই ভাগ্যের সাথে কোনদিন হয়নি তার চেনা-চেনি। এখন সম্পূর্ণ একাকী রবি।

তখন বিকেল সূর্যের তেজ কমে এসেছে। প্রকৃতি পাখিদের নিয়ে খেলায় মত্ত জীবনের প্রয়োজনে তারা ছুটে যাচ্ছে যে যার গন্তব্যে। আশ্রয় আর নিজের ঠিকানার উদ্দেশ্যে।

 হঠাৎ মোবাইল ফোনটা বেজে উঠে, অপরিচিত নম্বর। হ্যালো-অনেক দিনের পরিচিত অনেক দিনের চেনা কন্ঠস্বর কে? 

আমি রূপা! কেমন আছেন?

হৃদয়টা মোচর দিয়ে উঠে। সেই পুরনো কষ্টটা বাড়ে। আজ এত দিন পর, কি! মনে করে?

কেন ফোন দিতে মানা!

না তা হবে কেন?

বিয়ে করনি কেন? নির্বাক রবি উত্তর খঁুজে পায় না। কি করে বলবে এখনো প্রতিক্ষায় আছি। শুধু এতটুকু ভুল শুধরানোর জন্য। প্রতি নিয়ত রূপার খবর নিবার চেষ্টা করেছে রবি। রূপার মায়ের সাথে কথা হত।

অনেক সুখে আছে। কোন কিছুর অভাব নেই। সেই আবার শুর“। জীবন নতুন করে দুজনার পথ চলা। নতুন করে বঁাচার স্বপ্ন দেখা। আশা, বিশ্বাস ভালোবাসা পবিত্র।

কিন্তু অল্প সময়ে-বিস্মৃতির ছায়া, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব রূপার পিছুটান। রবির পরিবারের সবাই মেনে নিলেও মানতে পারেনি রবির বড় ভাই যে ভাবে হোক রূপার মনে….? বিশ্বাস ভাঙ্গলে মন ভেঙ্গে যায়।

 একদিন হাসপাতালে রবি। সুযোগ....। রূপা খবর পেয়ে ফোন দেয় বড় ভাইয়ার কাছে। 

 এমন সুযোগ অনেক দিনের। তুমি যা শুনেছো সব মিথ্যা। ওর এমন অভিনয় আমরা অভ্যস্ত রবি আমার ভাই হলে কি হবে। তিন দিন যোগযাযোগ নেই। কি অপেক্ষা করছে রবির অজানা। আবারও অবিশ্বাস আর ঘৃণায় মুখ 

ফিরিয়ে নেয় রূপা। রবি বুঝাতে চেষ্টা করে। মন তো......? রূপার সাফ কথা। অনেক বার ঠকেছি। আর ঠকতে চাই না। আমি ভুল করেছি আবার তোমার সাথে সম্পর্ক করে। আবারও তোমার মত প্রতারক মিথ্যুক লম্পটকে ভালোবেসেছি, বিশ্বাস করেছি। আমি ভুলে যাব সব।

 আমি ভুলে যাব তোমাকে। তুমি  কে? আমার স্বামী আছে। সন্তান আছে। তারা আমার অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ। নিজের কানকে বিশ্বাস করাতে পারে না রবি। ভাগ্য-ই সব। সবার ভাগ্যে প্রেম ভালোবাসা থাকে না। “কষ্টই সুখ”

ভালোবাসার যোগ-বিয়োগ নিয়ে কিছু কথা বলতে গেলে মনে হয়, এটি এক ধরনের ক্যালকুলাস—যেখানে হৃদয়ের অংক কখনও শূন্য দেয়,

কখনও অসীম।ভালোবাসা বাড়ে ছোট ছোট মুহূর্তে—একটা ফোনকল, একটা হাসি, অকারণে জড়িয়ে ধরা, কিংবা রাতজাগা কথোপকথনে।

এই যোগফল এতটাই শক্তিশালী যে তা দু’জনকে এক করে দেয়, যেমন নদীর দুই ধার কখনও আলাদা হয় না।অহংকার, অবহেলা, বা দূরত্ব যখন ভালোবাসা থেকে বিয়োগ হয়, তখন টুকরো টুকরো হতে থাকে সম্পর্ক।

কিন্তু মজার বিষয় হলো, এই বিয়োগ যদি বোঝাপড়া দিয়ে ভাগ করা যায়, তাহলে ফলাফল আবারও ভালোবাসাই থাকে।

স্বাগতম “শিরোনাম সাহিত্য”-এ — আমার হৃদয়ের ক্যানভাসে।
এই ব্লগটি আমার স্বপ্ন, ভাবনা আর সৃজনশীলতার একটি আড্ডাখানা।
এখানে বাংলা সাহিত্যের রঙে মুখর হয়ে ওঠে কবিতা, গল্প আর জীবনের ছোট ছোট মুহূর্ত।

আমি একজন গল্পকার, কবি এবং বাংলা ভাষার একনিষ্ঠ প্রেমিক।
“শিরোনাম সাহিত্য” আমার সেই প্রয়াস, যেখানে শব্দ দিয়ে গড়ে তুলি আবেগ, চিন্তা আর কল্পনার জগৎ।

এখানে পাবেন হৃদয় ছোঁয়া কবিতা, জীবনের গল্প, আর সাধারণ মুহূর্তের অসাধারণ রূপ।

আমার লক্ষ্য:
বাংলা ভাষার প্রেমীদের জন্য একটি আশ্রয় তৈরি করা।
যেখানে শব্দের জাদুতে আমরা সবাই হারিয়ে যেতে পারি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *