সিরাজুল ইসলাম মুন্টু
ছোট গল্প
ওসমান ব্যাপারী আজ সকালে এসে উকিলের চেম্বারে বসে আছে ওর সাথে আছে
দোকানের বিশ্বস্ত কর্মচারী মতি মিয়া, ওসমান ব্যাপারীর দুটো মামলার দিন আছে
আজ। একটা তার ছেলের আর একটা তার মেয়ের, ওসমান ব্যাপারীর ছেলে
শিউলী নামের এক মেয়েকে কিডন্যাপ করে তাকে ধর্ষন করেছে।
মনিরেরা তিন জন মিলে মেয়েটাকে ধর্ষন করেছে আর ধরা পড়েছে ওসমান ব্যাপারীর ছেলে
মনির। আর মেয়ে মালা তার কলেজের এক হিরোইন খোর সিজারকে বিয়ে
করেছে বাড়ি থেকে পাঁচলক্ষ টাকা নিয়ে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছে।
মনিরের মামলায় মনিরের যেন সাজা না হয় সে আশায় অনেক বড় বড় উকিল
দাড়করাবে কোর্টে আর মালা যেন আবার ঘরে ফিরে আসে সে আশা নিয়ে
ওসমান ব্যাপারী আজ কোর্টে এসেছে। ওসমানের জীবনে আজ চরম
পরীক্ষা।ওসমান ব্যাপারীর সুখের সংসার। এক ছেলে এক মেয়ে স্বামী স্ত্রী এই চার
জনের সুখের সংসার।
ওসমানের ছেলে বড় এবং একমাত্র ছেলে মনির। মনির
গত কয়েক বছর আগে এইচ,এস,সি পরীক্ষার হল থেকে বহিস্কার হবার পর
থেকে সেই যে, বখাটেদের দলে ভিড়ে গেল। ওসমান ব্যাপারী অনেক চেষ্টা
করেও ফিরাতে পারেনি, তাছাড়া মনির একমাত্র ছেলে হওয়ায় তার মা জামিলা
একটু বেশি আদর যতড়ব এবং ভালবাসত।
ওসমান কিছু বললে জামিলা মনিরের পক্ষ নিয়ে সবকিছু হালকা করে দিতো এতে করে মনির আরও বেশি লাই পেয়ে
একেবারে মাথায় উঠে গেছে আর মাথা থেকে হাজার চেষ্টা করেও নামানো সম্ভব
হয়নি।
ছেলে মেয়েদের বেশি আদর সোহাগ করলে তারা যে, মানুষ হয়না সেকথা
ওসমান ব্যাপারী হাড়ে হাড়ে বুঝে গেছে। কিšদ বুঝে তো কোন লাভ নেই। তখন
সমাধান করার কিছু নাই তখন যার কর্মফল তাকে ভোগ করতে হবে।
ওসমানের পিতৃহৃদয় তাইতো সবকিছু জেনে শুনেও আশায় বুক বেধে আছে। যে, তার ছেলে
মুক্তি পাবে, অপরাধী যদি তার সাজা সম্পর্কে আগে থেকে জানতো তাহলে সে
কখনোই অপরাধ করতনা। মনিরের উড়তি বয়স ভাল লেগে যায় শিউলী নামের
এক মেয়ে কে।
মনির ভেবেছিল শিউলী তার প্রস্তাব সহজে মেনে নেবে। মনিরের কথা মেনে নিয়ে
মনিরের লালসার বলি হবে। কিšদ না শিউলী তা মেনে নেয়নি। মনির তাকে
অনেক রকমের প্রলোভিত করতে চেয়েছে। শিউলী ঝালমুড়ি ওয়ালার মেয়ে
হলেও সে টাকার লোভে কিংবা ভালবাসার অভিনয়ে ভুলেনি।
নিজেকে বিলিয়ে দেয়নি বাজারের মেয়ের মত। এত কিছু প্রলোভন দেখিয়ে যখন শিউলীকে বশে আনতে পারেনি মনির তখন সে হি¯্র পশুর আকার ধারন করেছে। এমনিতেই
মনির সন্ত্রাসী চাঁদাবাজী ছিনতাই এর সাথে জড়িত ছিল। সে শহরের নষ্ট
মানুষদের সাথে মিশে একেবারে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
কয়েকদিন আগে শিউলী যখন স্কুল থেকে ফিরছিল তখন মনির তার কয়েকজন
গুন্ডা বাহিনী নিয়ে তাকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। শিউলীর বাবা থানায় খবর দিলে
পুলিশ শিউলী কে মুমূর্ষ অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠালে শিউলী
হাসপাতালে মারা যায়।
পুলিশ ঐ স্থানে মনিরের মানিব্যাগ ছবি উদ্ধার করে এবং পরবর্তীতে মনিরকে ধরে
জেল হাজতে বন্দি করে রাখে। আজ মনিরের মামলার রায় ঘোষনা হবার কথা
ওসমান ব্যাপারী চায় তার সহায় সম্পদ সব দিয়ে হলেও তার ছেলে মনিরের যেন
কোন সাজা না হয়।
মনিরের বাবা ওসমান ব্যাপারী শিউলীর বাবা রহমত ঝালমুড়ি ওয়ালার কাছে
গিয়েছিল। কয়েক লক্ষ টাকাও দিতে চেয়েছিল। রহমত রাজী হয়নি। আমি কার
জন্য টাকা নেব। আমার সংসারে ঐ মেয়ে ছাড়া আর কেউ নেই। পাঁচ বছরের মা
মরা মেয়েকে নিয়ে আমি শহরে এসেছিলাম।
ভেবেছিলাম গ্রামে যত সব অশিক্ষিত মূর্খ গরীব মানুষ বাস করে। শহরে যেমন বৈদ্যুতিক আলোর ঝলকানি আছে
তেমনি আছে মানুষের মনে সভ্যতার আলো শিক্ষার আলো। শহরে বাস করে
আলোকিত মানুষ। যেখানে মানুষের জানমাল মান সম্মান সব নিরাপদ থাকবে।
আমি গ্রাম থেকে আসি গরীব মানুষ জীবন জীবিকার তাগিদে এখানে এসেছি।
ঝাল মুড়ি বেচে যা পাই তা দিয়ে বাপ মেয়ে খেয়ে দেয়ে মেয়েটাকে মানুষ করব
সে আশায় দিনরাত পরিশ্রম করি। আমার রাজ প্রাসাদ দরকার ছিলনা। আমি
কিছুই চাইনা ভাই। আমার মেয়েটাকে ফিরিয়ে দেন। আমি গ্রামের মানুষ গ্রামে
চলে যাব। আর কোনদিন আপনাদের শহরে আসবনা।
টাকা নয় আমার মেয়েটাকে ফিরিয়ে দেন। ঐ মেয়েটা ছিল আমার জীবনে আশার তরী সেই
তরীটাই আমার ডুবে গেল, বলতে পারবেন ওসমান ব্যাপারী আমি কি নিয়ে
বাঁচব। মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে আর বিয়ে করিনি।
আমার একমাত্র অবলম্বন কেন কেড়ে নিলেন ওসমান সাহেব। আমার মেয়ের চেয়ে সুন্দরী মেয়েকি
এই শহরে ছিলনা। তবে কেন আপনার ছেলে আমার মেয়ের এমন সর্বনাশ করে
আমাকে অকুলে ভাসাল।
ওসমান সাহেব আপনি চলে যান, হাজার কোটি টাকা দিলেও আমি মামলা তুলে
নেব না। আমি কার জন্য টাকা নিবো। আমি টাকা নিলে শিউলীর আত্বা আমাকে
ক্ষমা করবেনা। শিউলীর মায়ের আত্মা ও আমাকে ক্ষমা করবেনা।
আমি চাই অপরাধীর উচিত শাস্থি হোক, আমাকে অকারনে টাকার লোভ দেখাবেন না ওসমান ব্যাপারী। টাকা আপনাদের মত মানুষের জীবনের সব হতে পারে।
তাছাড়া আপনার মেয়ে যদি হতো শিউলী আপনে কি করতেন ওসমান ব্যাপারী,
আপনি কি করতেন?
আমার শিউলীর মৃত্যুর বিচার দেখে আর যেন কোন বখাটে
আর কোন শিউলীর উপর অত্যাচার করার সাহস না পায়, অপরাধীর শাস্থি হোক
এটা আমি মনে প্রাণে চাই।
ওসমান ব্যাপারী রহমতের কথাশুনে খুব লজ্জা পেল। সত্যিইতো শহরে আসা
গ্রামের মানুষ গুলো শহরের মানুষ গুলো যদি নিরাপত্তা দিতে না পারে তাহলে ওরা
আর কোথাই যাবে। ওসমান ব্যাপারীও মনের সিদ্ধান্ত পালটে ফেলেছিল যে,
মনিরের যাই হোক সে কোন উকিল ধরবেনা।
ওসমানের স্ত্রী জামিলার কানড়বা দেখে সে তার সিদ্ধান্তে অটল থাকতে পারেনি। বদলে গেছে।
মনিরের মামলা কোর্টে উঠল। সাক্ষী প্রমানে মনির দোষী সাব্যস্থ হওয়ায় আদালত
তাকে যাবত জীবন কারাদন্ড দিলো। ওসমান ব্যাপারী দু’চোখের জল মুছতে
মুছতে কোর্ট থেকে বের হয়ে আবার উকিলের চেম্বারে এলো।
এবার মালার মামলা কোর্টে উঠবে। ওসমান ব্যাপারী সিজারের নামে নারী অপহরণের মামলা
দায়ের করেছে। ওসমানের একমাত্র মেয়ে মালা কলেজে পড়ে। একই কলেজের
ছাত্র সিজার কে ভালবাসে। সিজার নেশাখোর বলে বাবা মা তাকে দেখতে
পারেনা। ওসমান এবং মালার মা জামিলা অনেক নিষেধ করেছে অনেক
বুঝিয়েছে। কিšদ মালা কোন কথা শুনেনি।
বান্ধবীর বিয়েতে যাচ্ছে বলে। কাপড় চোপড় সহ পাঁচলক্ষ টাকা নিয়ে সিজারকে
বিয়ে করেছে। এই বিয়েটাকে মেনে নিতে পারবেনা বলেই ওসমান ব্যাপারী
মামলা করেছে।
আদালতে দাড়িয়ে মালা ওসমানকে উদ্দেশ্য করে বলল, উনি আমার বাবা নন।
তাছাড়া সিজার আমাকে অপহরণ করেনি। আমরা পরস্পরকে ভালবাসি। আমার
বিয়ের প্রয়োজন তাই বিয়ে করেছি।
উনি যদি আমার বাবা হতেন তাহলে আমার
পছন্দের ছেলের সাথেই বিয়ে দিতেন। ঘর সংসার করব আমি আমার যাকে
ভাললাগবে আমি তাকেই বিয়ে করব উনার তাতে আপত্তি থাকার কথা কেন
থাকবে?
মতি ওসমান ব্যাপারীকে ধরে একরকম জোর করে বাসায় নিয়ে এলো কিছুক্ষন
সবাইকে সান্তনা দিয়ে মতি নিজের বাসায় চলে গেল।
রাতে জামিলা বলল, মনিরের বাবা তুমি আমার মনিরের জন্য কিছুই করতে
পারলে না। না গো মনিরের মা আমি কিছুই করতে পারলাম না।
তোমার ছেলেটার যাবত জীবন হলো। মানে মনিরের যাবত জীবন জেল আর মালা যদি
আমাদের পছন্দ মত কিংবা স্বাভাবিক ভাবে বিয়ে করত তাহলে মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতে নাইওর আসতে পারত। যেহেতু সে নিজের মত বিয়ে করেছে
তাই আজীবন আমাদের বাড়িতে আসতে পারবেনা। মালার ও যাবত জীবন খোলা
জেল হয়ে গেছে।
মনিরের বাবা আমি কি নিয়ে বাঁচব। যা নিয়ে বাঁচবে শিউলীর বাবা রহমত,
জামিলা একদিন তুমি আর আমি একা ছিলাম। কত তদবির তাগাদা দরগায় সিনিড়ব
মানত করে ছেলে মেয়ে পেলাম।
আমাদের যত আদর যতড়ব সব উজাড় করে
দিলাম, কিšদ তবু ওদের মন পেলাম না, আমাদের ভালবাসা ওদের মনকে তৃপ্ত
করতে পারেনি। ওরা আমাদের মান সম্মান আদর ভালবাসা সব পায়ে ঠেলে
যেযার মত সুখের সন্ধানে চলে গেল। আমরা আগের যে দু’জন ছিলাম এখন সে
দু’জন। এখন বলো কার জন্য কি করলাম।
জামিলা আমাদের জীবন এমন কেন হলো। মনিরের বাবা, জামিলা জীবন যখন যেমন, তখন তাকে মেনে নিতে হয়।
তুমি কাঁদছ কেন জামিলা, যাদের ছেলে মেয়ে নাই তারা কি বেঁচে থাকছেনা।
আমরাও তাই ভেবে নেব। জামিলা চোখ মুছো।
চলো ছাঁদে যাই, অনেক দিন পূর্ণিমার চাঁদ দেখিনি চলো পূর্ণিমার চাঁদটাকে দেখে দুঃখ ভুলার চেষ্টা করি।
চলো। দু’জনে ছাদে গিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে কি যে বলল, আমি
শুনতে পাইনি হয়ত ওসমান ব্যাপারী জামিলা আর তাদের অন্তর যামীই জানে।
গল্প সম্পর্কে
জীবন যখন যেমন পরিস্থিতি দেয়, মানুষকে তেমনভাবেই নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়। দুঃসময় আমাদের ধৈর্য শিখায়, কষ্ট আমাদের শক্ত করে তোলে, আর সুখের সময় কৃতজ্ঞ হতে শেখায়। জীবনের প্রতিটি অধ্যায় আমাদের কিছু না কিছু শিক্ষা দেয়—কখনো আশা রাখতে, কখনো নতুন করে শুরু করতে।
জীবন যখন যেমন তাই শুধু একটি কথা নয়, এটি একটি উপলব্ধি। এর মধ্যে রয়েছে সংগ্রাম, স্বপ্ন, ভালোবাসা আর আত্মবিশ্বাসের গল্প। যে মানুষ জীবনকে তার বাস্তব রূপে মেনে নিতে পারে, সে-ই শেষ পর্যন্ত সত্যিকারের শান্তি ও সাফল্য খুঁজে পায়।
আমাদের সম্পর্কে
স্বাগতম “শিরোনাম সাহিত্য”-এ — আমার হৃদয়ের ক্যানভাসে।
এই ব্লগটি আমার স্বপ্ন, ভাবনা আর সৃজনশীলতার একটি আড্ডাখানা।
এখানে বাংলা সাহিত্যের রঙে মুখর হয়ে ওঠে কবিতা, গল্প আর জীবনের ছোট ছোট মুহূর্ত।
আমি একজন গল্পকার, কবি এবং বাংলা ভাষার একনিষ্ঠ প্রেমিক।
“শিরোনাম সাহিত্য” আমার সেই প্রয়াস, যেখানে শব্দ দিয়ে গড়ে তুলি আবেগ, চিন্তা আর কল্পনার জগৎ।
এখানে পাবেন হৃদয় ছোঁয়া কবিতা, জীবনের গল্প, আর সাধারণ মুহূর্তের অসাধারণ রূপ।
আমার লক্ষ্য
বাংলা ভাষার প্রেমীদের জন্য একটি আশ্রয় তৈরি করা।
যেখানে শব্দের জাদুতে আমরা সবাই হারিয়ে যেতে পারি।
4 thoughts on “জীবন যখন যেমন”